বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ও করণীয়

রাব্বী হাসান রফিক
বাংলাদেশ এই মুহুর্তে একটা সংকটকালীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে।শুধু বাংলাদেশ নয় সারাবিশ্বই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।জীবনযাত্রা তো থমকে গেছেই,থেমে গেছে অর্থনীতির চাকাও।
সকলেই অবগত আছেন যে,এই মুহুর্তে করোনা ভাইরাস সংক্রমনের কেন্দ্র হলো ইউরোপ।ইতোমধ্যেই ইতালীতে মৃতের সংখ্যা চীনের সংখ্যাকে অতিক্রম করে গেছে।স্পেনের অবস্থাও ভয়ানক।মিডিয়া মারফতে জানা গেছে ইউরোপের বর্তমান সংক্রমিত দেশগুলি শুরুর দিকে অতটা গুরুত্ব দেয় নি।যার ফলাফল বর্তমান ভয়াবহ ও করুণ অবস্থা,সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক মানবিক দূরাবস্থা।
অন্যদিকে,ব্যাপক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রচারণা ও সচেতনতার ভিত্তিতে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় অনেকটাই সফল হয়েছে তাইওয়ান,সিংগাপুর,থাইল্যান্ডসহ ঝুঁকিতে থাকা অনেকগুলি দেশ।বর্তমানে চীনের ডোমেস্টিক সংক্রমণের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়।
বাংলাদেশেও বর্তমানে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার উর্ধ্বমুখী।আমরা দেখেছি অন্যান্য দেশে এটি এক্সপোনেশিয়ালি বৃদ্ধি পেয়েছে।২,৪,১০,৫০,২০০,১৫০০,৩০০০ এরকমভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে দুই তিন সপ্তাহের ব্যবধানেই।
IEDCR এর জরীপ অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ এবং একজন মারা গেছে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশীও হতে পারে,যেগুলি এখনো সনাক্তই হয় নি হয়তো।আমরা যদিও অনেক দেরী করে ফেলেছি,তবুও এখনো অনেক করণীয় আছে সরকার থেকে শুরু করে সকল শ্রেণীর দায়িত্বশীল ও আপামর জনসাধারণের।কিছু করণীয় নিচে উল্লেখ করা হলোঃ
ক. সরকারী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় করণীয়সমূহঃ
১.প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম বিবেচনায় সারাদেশের সকল রিসেন্ট বিদেশফেরত মানুষকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন ও প্রয়োজনানুসারে আইসোলেশনে রাখা হোক।এক্ষেত্রে প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে সরাসরি সরকারী হস্তক্ষেপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২.দেশের সকল স্তরের স্বাস্থ্যসেবা পেশায় নিয়োজিত ব্যাক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করে এলাকাভিত্তিক স্পেশালাইজড জরুরী টিম গঠন করতে হবে।প্রয়োজনের নিমিত্তে সরকারী ডাক্তারদের পাশাপাশি অন্যান্য ডাক্তারদেরকেও যোগ করতে হবে।বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে শক্তিশালী বোর্ড গঠন করতে হবে।গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট, হেলথ টেকনোলজিস্ট ও সকল পর্যায়ের নার্সদেরকে ইনক্লুড করেই একটি কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এটা খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই।এক্ষেত্রে হেলথ প্রফেশনালদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতে হবে।
৩.স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে অন্যান্য রোগীদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে।প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলিও সরকারী নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
৪.প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে সারাদেশে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে,সাধারণ মানুষকে ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝাতে হবে।টিভি চ্যানেল,মোবাইল অপারেটর,সামাজিক মাধ্যমগুলিতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
৫.বিদেশফেরত ব্যক্তিদের ঘনত্ব অনুযায়ী কিছু এলাকা লক ডাউন করে দিতে হবে।ইতোমধ্যেই মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা লক ডাউন করা হয়েছে। এমনিভাবে ব্রাম্মণবাড়িয়া,চট্রগ্রাম,সিলেট,নোয়াখালী,ফেনী,লক্ষ্মীপুরের কিছু এলাকাসহ অন্যান্য এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে প্রয়োজনে লক ডাউন করতে হবে।
৬.স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়,IEDCR,WHO সব প্রতিষ্ঠানকে একত্রিত করে উচ্চপর্যায়ের গবেষণা টিম গঠন করতে হবে যেখানে ডাক্তার,ফার্মাসিস্ট,মাইক্রোবায়োলজিস্ট,ভাইরোলজিস্ট,বায়োকেমিস্ট সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
৭.ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে প্রয়োজনীয় ঔষধ ও মেডিকেল ইনস্ট্রুমেন্টস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৮.নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে মোবাইল টিম পরিচালনা করতে হবে।অসাধু ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট দমন করতে হবে।
৯.জরুরী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করতে হবে।
১০.দেশ বড় ধরণের অর্থনৈতিক মন্দায় যাতে না পড়ে যায় সেজন্য জরুরী ব্যবসায়িক ও ব্যাংক কার্যক্রম সচল রাখতে হবে।
খ.বিভিন্ন পেশাজীবীদের করণীয়সমূহঃ
১.সকল ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও সেবা দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
২.জরুরী সেক্টর যেমন, স্বাস্থ্যখাত,প্রশাসন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী,সেনাবাহিনী ইতাদিতে কর্মরত ব্যক্তিদেরকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতে হবে।
মনে রাখবেন, জাতির এই সংকটকালীন মুহুর্তে আপনাদের প্রত্যেকের একান্ত সহযোগীতা খুবই প্রয়োজন।
গ. জনসাধারণের করণীয়সমূহঃ
১.সরকারের সকল কার্যক্রমে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা।
২.নিজে সতর্ক থাকা,অন্যকে সতর্ক করা।
৩.সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা।
৪.জনসমাগম এড়িয়ে চলা।
৫.নিয়মিত বিরতিতে সাবান পানি দিয়ে হাত ধৌত করা।
৬.পরিবারের ষাটোর্ধ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া।
৭.অসুস্থ ব্যক্তিদেরকে আলাদা রাখা।
৮. বিদেশফেরত সদস্যদেরকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে উদ্বুদ্ধ করা।
৯.সকলের জন্য দোয়া করা।
১০.যেকোনো সংকটময় মুহূর্তের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা ও ধৈর্য্য ধারণ করা।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এই মহামারী থেকে আমাদের সকলকে রক্ষা করুন।ভালো থাকুক আমার দেশের সকল মানুষ,ভালো থাকুক বাংলাদেশ,ভালো থাকুক পুরো পৃথিবী

 

লেখক: শিক্ষার্থী,ফার্মেসী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
কভিড-১৯করোনাকরোনা ভাইরাস
Comments (০)
Add Comment