ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ

আইসিডিডিআর, বি

0

গত শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝিতে সোভিয়েত জোটের ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে সাউথইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন (South- East Asia Treaty Organization) সিয়াটো। ঠিক একই সময় মার্কিন সেনা সদস্যরা ভিয়েতনামের যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিল । এই অবস্থায় মার্কিন সৈন্যদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে ,

এই অঞ্চলে কলেরার প্রাদুরভাব অনেক বেশি  হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন এই বিষয়টি নজরে নেয় । সেই থেকে কলেরা গবেষণার জন্য একটি কাঠামো স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। পাকিস্তান সরকার এবং সিয়াটোর যৌথ প্রকল্পের অধীনে ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত হয় “পাকিস্তান কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (পিসিআরএল)। যেহেতু একসময় ভারতীয় উপমহাদেশে ‘কলেরা রোগের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল, তাই সংস্থাটি কলেরা’কে পুরোপুরি নির্মুল করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।

সংস্থাটি ১৯৬৩ সালে চাঁদপুরের মতলবে একটি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে ।বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে যুক্তি সংগত কারণেই ধীর হয়ে যায় সংস্থার কার্যক্রম। এর বেশ কয়েক বছর পর  ১৯৭৮ সালে, দেশ বিদেশের কয়েকজন উদ্যোগী বিজ্ঞানী “কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে” একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে  আবেদন করে, সরকার আবেদনে সাড়া দেয় এবং জাতীয় সংসদে একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংস্থাটির নতুন নাম দেয়া হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ’ সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে আইসিডিডিআর, বি ।

নদী বিধৌত অঞ্চল বিধায় বর্তমান চাঁদপুর জেলার ‘মতলব’ এলাকায় একসময় কলেরা’র প্রকোপ ছিল ভয়াবহ! প্রায়শই এখানে মহামারী আকারে দেখা দিত কলেরা।এখানে নদীপথ ছাড়া স্থল পথে, আসারও কোন উপায় ছিল না তখন, তাই আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা সুবিধা দেবার সুযোগও ছিল কম। ১৯৬০ সালে একদল মার্কিন ও বাংলাদেশি গবেষকগণ ঢাকা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে মতলবে আসেন এবং তার আশে পাশে এলাকা ভ্রমণ করেন। তাদের কাজ ছিল মতলব সংলগ্ন এলাকা সমূহ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, এলাকার মানুষের সাথে মত বিনিময় করা এবং কলেরার বিরুদ্ধে লড়াই করবার পদ্ধতি সমূহ জানিয়ে দিয়ে তাদের সচেতন করে তোলা । কেননা তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, মতলবে এমন একটি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা , যা শুধুমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না বরং সেটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম একটি প্রসিদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র। তাই এই কাজের পূর্বে এলাকাবাসীর বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জন করার ব্যাপারটিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন তারা । আর এভাবেই ১৯৬৩ সালে মতলবে মাঠ পর্যায়ে তাদের ব্যপক কার্যক্রম শুরু হয়।

১৯৬৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত, মতলবে কলেরা রোগের বিভিন্ন টিকার কার্যকারিতার উপর ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, সেই সাথে ঔষধ, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উপরও গবেষণা পরিচালিত হয়। মতলবে স্থাপিত হেলথ্ এন্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভিল্যান্স সিস্টেমটি বর্তমানে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাঝে বহুল আলোচিত ও বিখ্যাত একটি মডেল ৷ এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো দীর্ঘমেয়াদী (longitudinal) সার্ভিল্যান্স সিস্টেম ৷ এর মাধ্যমে শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির অনেক মৌলিক ধারণা আবিষ্কৃত হয়েছে ৷

ফলে মতলব অঞ্চল বিশ্বভিত্তিক কর্মসূচীর গবেষণা ও কর্ম-এলাকা হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে ৷ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া চিকিৎসায় জিংকের উদ্ভাবনও এ কেন্দ্রের গবেষণা কর্মের আরও একটি মাইলফলক ৷ ডেঙ্গু, নিপা, সার্স এর মত সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে ,আইসিডিডিআর, বি মতলব রিসার্চ সেন্টার – বাংলাদেশ সরকারকে অব্যাহত সহায়তা প্রদান করে আসছে ৷ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা ও মতলবস্থ হাসপাতাল/ক্লিনিকের মাধ্যমে বছরে দেড় লক্ষাধিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে ৷

মতামত দিন
Loading...