অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে নিয়ম মেনে

মাহফুজুর রহমান

0

অ্যান্টিবায়োটিক শব্দটি এখন সবার মুখে মুখে, আসলে আমরা কি জানি অ্যান্টিবায়োটিক কি ? আমাদের শরীরটা  একটু খারাপ হলেই নিজেদের ইচ্ছে মত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে থাকি। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এটা সেবন কতটা নিরাপদ তা কি একবারও ভেবে দেখেছি? ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যাস থাকলে জেনে নিন, কখন কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া উচিত।

 অ্যান্টিবায়োটিক বলতে আমরা কি বুঝি ?

অ্যান্টিবায়োটিক অর্থাৎ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ড্রাগ।অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ড্রাগ ব্যাকটেরিয়া কে নির্মূল করে, পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার দৈহিক বৃদ্ধি এবং তার কলোনিগুলিতে বংশ বিস্তার রোধ করা।তবে অ্যান্টিবায়োটিক কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া-ঘটিত ইনফেকশনই প্রতিরোধ করে।

অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে কিছু বিষয় আমাদের জেনে রাখা ভাল

অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে রোগীর অসুখ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে।অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার আগে জেনে নেওয়া উচিত, সেই ওষুধের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না।অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার আগে রোগীর সংবেদনশীলতা পরিক্ষা করে নেওয়া উচিত।একই অ্যান্টিবায়োটিক  একজনের জন্য জীবন রক্ষাকারী আরেকজনের জন্য প্রানসংহারিও হতে পারে।  যথেচ্ছ পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক একেবারেই খাওয়া উচিত নয়।রোগীর লিভার ও কিডনির অবস্থা বুঝে তবেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত।অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর ত্বকে র‍্যাশ, চুলকানি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিক দ্রুত কোন ধরনের রোগীদের দেওয়া উচিত

ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ মুক্ত করতেই মূলত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত ।যেকোনো ইনফেকশনের সময় যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাকটেরিয়ার দৈহিক বৃদ্ধিও তার কলোনির বংশবিস্তার রোধ করা প্রয়োজন।মেনিনজাইটিস, নিউমোনিয়া, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন এবং সেপটিসিমিয়া, এই চারটি রোগে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত।

 যে কোন জ্বর হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত ?

জ্বর হলে আগে থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।কারণ পরবর্তীকালে রক্ত পরীক্ষা করলে সঠিক রেজাল্ট পাওয়া যায় না।তার ফলে চিকিৎসায় দেরি হতে পারে।জ্বর হলে প্রথমে তার কারণ খোঁজা উচিত।ডাক্তারকে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে অনুরোধ করা থেকে বিরত থাকুন। আজকাল  শিশুদের ক্ষেত্রে বাবা মারা প্রায়ই একাজ করে থাকে। তাতে করে শিশুদের পরবর্তিতে ক্ষতির সম্ভবনা থাকে।

অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ম মেনে না খেলে ঘোর বিপদ !

অ্যান্টিবায়োটিক অতিরিক্ত খাওয়া ক্ষতিকারক, পাশাপাশি নির্দ্দিষ্ট সময়কাল  থেকে কম খাওয়াও উচিত নয়।ওষুধ খাওয়ার সময়কাল থেকে কম সময় খেলে ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ ভাবে না মরেযাওয়ার সম্ভবনা থাকে,তাতে ফেরসংক্রমণ দেখা দেবার ঝুকি থাকে। বেশি খেলে ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্ত্রে অনেক উপকারি ব্যাকটেরিয়া  থাকে, সেগুলিও মরে যায়।যার ফলে বেশ কিছু খারাপ রোগ দেখা দেয়।একই সঙ্গে অপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলি তখন বৃদ্ধি পেতে থাকে।বাংলাদেশে সম্প্রতি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের এক গবেষণায় দেখা গেছে,ইচ্ছেমত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করার কারণে গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্তত ১৭ রকমের  অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, অর্থাৎ এগুলো অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়ে গেছে, যারা মানে হলো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধী হয়ে ওঠছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়ে যাওয়ার কারনে রিজার্ভ অর্থাৎ প্রচলিত নয় সেরকম অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ বেড়ে গেছে।

কেন অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়?

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কোন নীতিমালা নেই।কিছু নির্দেশনা থাকলেও সেগুলো বিক্রেতা বা ক্রেতা কেউই মানে না। তাছাড়াও ভোক্তা পর্যায় অসচেতনার কারনেও অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়ে থাকে। মুলত আরও কিছু কারনে  অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়ে থাকে।  কারনগুলো হল-

  • ইচ্ছেমত বিনা প্রেসক্রিপশনে ঘনঘন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে
  • রোগীর যতটুকু প্রয়োজন তার থেকে বেশিপরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হলে
  • অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করার পর সুস্থতা অনুভব করলে মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা বন্ধ করে দিলে (ডোজ কমপ্লিট না করলে) ।
  • অনেক সময় ভাইরাস জনিত কারনে অসুস্থতা অনুভব হয় যা কি না কিছুদিন পর এমনি এমনিই ভাল হয়ে যায়, এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঘটনা বেশি ঘটে।
  • ঘনঘন বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন করা।

বিশেষ করে আমাদের দেশের নিম্নআয়ের লোকজন কিছুটা অসুস্থ হয়ে পরলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ফার্মেসী থেকে ইচ্ছেমত ওষুধ (অ্যান্টিবায়োটিক)  কিনে সেবন করে। যার ফলে তাদের অজান্তেই তাদের শরীর অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়ে যাচ্ছে, পরবর্তীতে কোন সংক্রমণ হলে সেটা আর কোন ওষুধে সারছে না।

প্রাণিজ উৎসের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক কিভাবে শরীরে প্রবেশ করে ?

অ্যান্টিবায়োটিক শুধু যে আমরা ওষুধ হিসেবে সেবনের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে তা কিন্তু নয়, প্রতিদিন আমরা যেসব খাবার গ্রহন করি তার মাধ্যমেও কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। প্রতিদিন খাবার তালিকায় মুরগির মাংস, গরুর বা খাসির মাংস, দুধ এবং দুগ্ধ জাতীয় খাবার থাকে। মানুষের সঙ্গে-সঙ্গে এসব প্রাণীর ওপরেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, যা কখনোই পুরোপুরি বিলীন হয় না, মাটিতে রয়ে যায়। মাছেও হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়,শাকসব্জিতে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। যা কিনা পরবর্তিতে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এভাবে প্রাণিজ উৎস থেকেও আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে এবং মানব শরীর অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হয়ে যাচ্ছে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হলে কারা বেশি ঝুঁকিতে ?

অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হওয়ার কারণে সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরাও আইসিইউতে চিকিৎসা নেওয়া সাধারন ও বয়স্ক রোগীরা।ডব্লিউএইচও এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সালের পর অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের কারণে আর কোন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা থাকবে না। এর মারাত্নক ভয়াবহতা এড়াতে সুস্থ অনুভব করলেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স অবশ্যই শেষ করতে হবে।এসব থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে সচেতন হওয়া।অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে ভালভাবে জানা ও ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করা।  বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে সরকার কে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করা ও জনসচেতনতা বৃদ্বি করতে হবে।

লেখক: জৈষ্ঠ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, মাননিয়ন্ত্রণ বিভাগ ,পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেড।

 

মতামত দিন
Loading...